সমগ্র বিশ্বের মধ্যে একমাত্র ভারতেই ডায়াবেটিসের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী আমরা জানতে পারি, প্রায় ১১.৪% প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, যা প্রায় ২১ কোটিরও বেশি মানুষ, এবং শহরাঞ্চলে এই হার প্রায় ১০-১২%।
ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশন (IDF) অনুযায়ী, ভারতকে প্রায়শই বিশ্বের “ডায়াবেটিস রাজধানী” বলা হয়।
এবার প্রশ্ন হল এই ডায়াবেটিস জিনিসটি কি? কোনো রোগ?
উত্তর খুব সোজা। ডায়াবেটিস হলো একটি দীর্ঘমেয়াদী লাইফস্টাইল ডিজিজ।
যদি তাই হয়, তাহলে এটি রোগটির নিয়ন্ত্রণ নিশ্চই সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব। নিয়মিত যত্ন ও জীবনযাত্রার উন্নতির মাধ্যমে এই রোগকে খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
কিন্তু দুঃখের বিষয় এটাই যে, এই রোগ সম্পর্কে মানুষের সচেতনতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।
আর ঠিক এই কারণেই মানুষ অজান্তেই এই লাইফস্টাইল ডিজিজের কবলে পড়ে যায়।
আজকের এই আর্টিকেলে আমি প্রাকৃতিক চিকিৎসার ওপর ভিত্তি করে এমন ৫টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়মের কথা বলবো, যা প্রত্যেকটি ডায়াবেটিস রোগীদের পালন করা একান্ত উচিত।
ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ৫টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
১. সুষম ও নিয়মিত খাবার গ্রহণ (healthy diet plan):
প্রাকৃতিক চিকিৎসা (naturopathy) অনুসারে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের প্রথম এবং সবচেয়ে জরুরি ধাপ হলো স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস।
মনে রাখবেন খাদ্যই হল আপনার জন্য প্রধান ওষুধ। তাই সঠিক খাবার খাবেন, সঠিক সময় এবং নিয়ম মেনে। এমন অনেক খাবার, ফল, সবজি আছে যা আপনার জন্য হানিকারক হতে পারে। তাই প্রাকৃতিক চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে খাদ্যাভ্যাস করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
কোন খাবার খাবেন?
যেই খাবারে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম, সেই খাবার গ্রহণ করুন। Low-GI (গ্লাইসেমিক ইনডেক্স) যুক্ত খাবার যেমন: ওটস, ডালিয়া, ব্রাউন রাইস ইত্যাদি গ্রহণ করতে পারেন।
এছাড়া শাকসবজি ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার আপনার দৈনন্দিন গ্রহণ করা আবশ্যক। শুধু তাই নয়, কম চিনি যুক্ত ফল যেমন: আপেল, পেয়ারা, কমলা দিনে একবার খেতেই হবে।
সবথেকে বেশি প্রয়োজন আপনার প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা (ডাল, ছোলা, মাছ, ডিম)। অলিভ অয়েল, বাদাম, বিভিন্ন বীজ খেতে পারেন, তবে সেটা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুসারে।
কোন খাবার এড়াতে হবে?
অতিরিক্ত ভাত, সাদা আটা, সাদা পাউরুটি, মিষ্টি, সফট ড্রিঙ্কস, ভাজা-পোড়া খাবার, অতিরিক্ত লবণ ইত্যাদি।
২. প্রতিদিন ব্যায়াম করা (daily physical activity):
ব্যায়ামের কোনো বিকল্প নেই। প্রতিদিন যোগাসন এবং ব্যায়াম আপনার রক্তে ইনসুলিনের কাজ বাড়ায় এবং সুগার কমাতে সাহায্য করে। তবে ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে সব ব্যায়াম কার্যকরী নয়। মনে রাখবেন খালি পেটে ভারী ব্যায়াম করবেন না। বয়স্ক রোগীরা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।
কোন ব্যায়ামগুলো আপনি করতে পারেন?
প্রতিদিন সকাল এবং বিকেলে কমপক্ষে ৩০–৪৫ মিনিট হাঁটা অভ্যাস করা উচিত। যারা সাইক্লিং, সাঁতার করতে পারেন, তাদের প্রত্যেকদিন নিয়ম করে অভ্যেস করা উচিত। যোগব্যায়াম এবং হালকা স্ট্রেংথ ট্রেনিং করলে আরো ভালো।
৩. নিয়মিত ব্লাড সুগার চেক করা (Glucose Monitoring):
ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তের সুগার (গ্লুকোজ) লেভেলের ওঠানামা বুঝতে নিয়মিত পরীক্ষা খুব জরুরি। কারণ আপনি যেসব খাবার গ্রহণ করছেন, জুস পান করছেন – তার ভালো অথবা খারাপ ফল হচ্ছে কিনা জানার জন্য রক্তের গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
কখন মাপবেন?
১. টাইপ-২ রোগীদের ক্ষেত্রে সপ্তাহে একবার করে চেক করতে হবে।
২. ইনসুলিন ব্যবহারকারীরা সপ্তাহে দুইবার করে চেক করতে পারেন।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট:
১. HbA1c (৩ মাসে একবার)
২. লিপিড প্রোফাইল (lipid profile)
৩. কিডনি ফাংশন (KFT)
৪. চোখের রেটিনা পরীক্ষা (বছরে একবার)
৪. স্ট্রেস কমানো ও ভালো ঘুম নিশ্চিত করা (stress control & sleep):
স্ট্রেস হরমোন শরীরে সুগার বাড়িয়ে দেয়। তাই মানসিক তুলনামূলক শান্তি অত্যন্ত দরকার। অতিরিক্ত টেনশন হলে বেশি খাবেন না—এটি দ্রুত ব্লাড সুগার বাড়ায়।
কি করলে স্ট্রেস কমবে?
১. প্রণায়াম
২. মেডিটেশন
৩. হালকা যোগব্যায়াম
৪. পর্যাপ্ত ঘুম (৭–৮ ঘণ্টা)
৫. স্ক্রিন টাইম কমানো
৫. চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা (medical follow-up):
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে চিকিৎসকের নির্দেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনার চিকিৎসক আপনার রোগকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করাতে সহায়তা করবেন।
কি করবেন?
১. প্রেসক্রাইব করা ওষুধ সময়মতো খাবেন।
২. ইনসুলিন নিলে সঠিক ডোজ বজায় রাখবেন।
৩. নতুন উপসর্গ দেখলে দেরি না করে ডাক্তারকে বলবেন।
৪. পায়ের যত্ন নিন (ডায়াবেটিক ফুট প্রতিরোধ)
মনে রাখবেন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন নয়। সঠিক খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, স্ট্রেস কমানো, সুগার মনিটরিং এবং চিকিৎসকের নির্দেশ মানলেই জীবন অনেক সহজ হয়ে যায়।
সচেতনতা ও নিয়মিততা—এই দুই বিষয়েই ডায়াবেটিসকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আপনার দ্রুত আরোগ্য কামনা করি।
সতর্কতাঃ এই ওয়েবসাইট/ব্লগ/প্রকাশনায় প্রকাশিত সকল তথ্য ন্যাচারোপ্যাথি ও প্রাকৃতিক চিকিৎসা (Naturopathy & Naturopathy Treatment) সম্পর্কিত সাধারণ শিক্ষামূলক ও স্বাস্থ্য-সচেতনতামূলক উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে। এখানে দেওয়া কোনো তথ্যই চিকিৎসক বা যোগ্য স্বাস্থ্য-পরামর্শদাতার ব্যক্তিগত পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার শারীরিক অবস্থা, রোগের ধরন, পূর্ববর্তী স্বাস্থ্য-ইতিহাস এবং অন্যান্য চিকিৎসার উপর ভিত্তি করে চিকিৎসা পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে। তাই এখানে উল্লেখিত যেকোনো চিকিৎসা পদ্ধতি, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, ভেষজ ব্যবহার, বা অন্য কোনো স্বাস্থ্য–পরামর্শ গ্রহণের আগে অবশ্যই নিবন্ধিত চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত ন্যাচারোপ্যাথ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করুন। এই সাইটে থাকা তথ্য, কোনো ওষুধ, থেরাপি, পরীক্ষা, রোগনির্ণয় বা চিকিৎসা শুরু/বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, অসুবিধা বা ক্ষতির জন্য লেখক, সম্পাদক বা প্রকাশক কোনোভাবেই দায় বহন করবে না। কোনো জরুরি বা প্রাণঘাতী স্বাস্থ্যসমস্যার ক্ষেত্রে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি/নিবন্ধিত চিকিৎসা কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন।